আর্কটিক বা উত্তর মহাসাগর (Arctic Ocean) পৃথিবীর জলবায়ুর সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর ফলে পৃথিবীতে সামান্য যেই কয়টি জায়গা বড় পরিসরে ঝুঁকির মুখে আছে, আর্কটিক মহাসাগর সেই তালিকায় একদম উপরে থাকবে। শুধু বিগত পঁয়ত্রিশ বছরেই আর্কটিক মহাসাগর প্রায় বিশ লক্ষ বর্গকিলোমিটার বরফের আস্তরণ হারিয়েছে [1] যা কিনা গত পনেরোশ বছরের সম্মিলিত হারানো বরফের আস্তরণের চেয়ে বেশি! এই সংখ্যাটার ব্যাপকতা এবং গভীরতা বুঝানোর জন্য আমি একটি তুলনা দিয়ে দেখাতে চাই। ব্যাপারটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়ঃ যেহেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং সমুদ্রের উপরের স্তরের পানি দিন দিন গরম হচ্ছে, এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের জমে থাকা বরফ গলে যাচ্ছে এবং গত চার দশকে আর্কটিক মহাসাগরের বরফ প্রায় পনেরটি বাংলাদেশ এর সমান আয়তন হারিয়েছে! অজস্র মেরু ভালুক তার বাসস্থান হারিয়েছে, খাবারের অভাবে মারা গেছে (এবং যাচ্ছে) সহস্র সামুদ্রিক সীল। পৃথিবীর প্রতিটি মহাসাগর একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত, যার ফলে যখন আর্কটিকে বরফ গলে পানি হয়ে যায়, তখন তা অন্যান্য সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়। ইউরোপ, আমেরিকার প্রচুর প্রদেশ থেকে শুরু করে নীচু ভূমির দেশগুলি, যেমন, বাংলাদেশ, ইতালি, মালদ্বীপ ভয়াবহ বন্যার সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে [2]। তবে এই লেখাতে আমি অন্য একটি মারাত্মক ঝুঁকির কথা বলব যেটা সাধারণভাবে আমাদের মনোযোগ পায়না কারণ এই ব্যাপারটি সম্প্রতি গবেষণাপ্রাপ্ত। এই ব্লগে আমি কথা বলব বরফের আস্তরণের নিচে উঁকি দিয়ে ওঠা একটি নতুন বিপদ, একটি নতুন চ্যালেঞ্জ যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মোকাবেলা করার দ্বারপ্রান্তে।
নতুন বিপদের হাতছানি
ঐতিহাসিকভাবে, আর্কটিক মহাসাগরের বরফের পুরুত্ব সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিটারের মধ্যে ছিল। তুলনামূলক উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণত ঘরের মেঝে থেকে সিলিং এর উচ্চতা ৩ মিটারের মতো হয়। তবে গত চার দশকে এই পুরুত্ব এতোটাই কমে গেছে যে বেশ কিছু অঞ্চলে (বিশেষত কানাডিয়ান আর্কিপ্যালেগো এবং ব্যারেন্ট সমুদ্র) সারা বছর ধরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পুরু বরফ এর আস্তরণ থাকে। সাধারণত, যখন সূর্যের আলো কোনো পুরু বরফের আস্তরণের ওপরে পরে তখন তা সম্পূর্ণ বরফ ভেদ করতে পারে না। ফলাফলস্বরূপ, বরফের নিচের পানির স্তর পর্যন্ত সূর্যের রশ্মি পৌছায়না। কিন্তু এখন এই বরফের পুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে সারা বছর জুড়ে সূর্যের আলো আর্কটিক মহাসাগরের সমুদ্রের পানিতে উষ্ণতা জোগান দিচ্ছে। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পেয়ে আর্কটিক মহাসাগরের ওপরের স্তরের পানিতে থাকা ফাইটোপ্ল্যাংক্টন সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন তৈরি করছে, যা জন্ম দিচ্ছে নতুন জীবনের (organic life)। যদিও ফাইটোপ্ল্যাংক্টনকে বলা হয় পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান এবং কার্বন চক্রের একক, কিন্তু বরফের নিচে ক্রমাগত বেড়ে চলা এই জৈবজীবন চক্র প্রকৃতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবেনা। ফাইটোপ্ল্যাংক্টন এর পপুলেশন অন্য যেকোনো জৈব উপাদানের চেয়ে দ্রুত হারে বংশ বিস্তার করে থাকে, একে বলা হয় অর্গানিক ব্লুম বা জৈব বিস্ফোরণ। বছরের গরমকালীন সময়ে বরফমুক্ত পানিতে এদের উপস্থিতি সাধারণ হলেও বর্তমানে এই ব্লুম সারা বছর ধরেই আর্কটিক মহাসাগরে বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে [3]।
প্রথম সন্ধান
শুরুরদিকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে সূর্যালোক ছাড়া বরফে ঢাকা গভীর আর্কটিক মহাসাগরে এই ফাইটোপ্ল্যাংক্টন জীবনবিকাশ সম্ভব নয়। এই ধারণা বদলে যেতে সময় লাগে না যখন প্রথমবারের মতো ২০১১ সালের জুলাই মাসে আলাস্কার কাছাকাছি চাকচি সাগরের মহীসোপানে (continental shelf) প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বরফের আস্তরণের ঠিক নিচেই বিপুল পরিমাণে ক্লোরোফিলের অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়। এই ঘটনাই ছিল প্রথমবারের মতো এতো বড় পরিসরে বরফের ঠিক নিচে ক্লোরোফিল বা ফাইটোপ্ল্যাংক্টন এর অস্তিত্বের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়া। কার্যত, এই ব্লুমের ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট থেকে ওই অঞ্চলের নাইট্রেট এবং কার্বন বায়োমাসের ছাপ ধরা পড়েছিল [4]। এই ব্লুমের প্রধান জৈব উপাদান ছিল পেলাজিক (pelagic) নামের ডায়াটম যারা প্রধানত চেটোসেরোস (Chaetoceros), থ্যালাসিওসিরা (Thalassiosira), এবং ফ্রেগিলারিওপিসিস (Fragilariopsis) গোত্রের। এছাড়া যে হারে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছিলো তাও এক প্রকার অবিশ্বাস্য! প্রতিদিন গড়ে ১৪৪% হারে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রতি একক আয়তনে এই স্থানীয় অঞ্চলে ২ মিলিগ্রাম করে ক্লোরোফিল উৎপাদিত হচ্ছিলো [5]। বিজ্ঞানীরা আরও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যখন তারা খেয়াল করলেন এই বিস্তার শুধু পানির ওপরের স্তরেই না, বরং ৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত কার্যকরী ছিল। যখন ব্লুম সর্বোচ্চ হারে বেড়ে উঠছিল, তখন আশেপাশের এলাকার বরফ-পুকুর (melt pond) গুলো আয়তনে এবং সংখ্যায় বেড়ে যাচ্ছিলো। সামগ্রিক ব্যাপারটা কেবল এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি ধণাত্নক ফিডব্যাক চক্র (positive feedback loop) শুরু করে। তবে শেষ পর্যন্ত বাতাসের গতিবিধি পরিবর্তন, শক্তিশালী বাতাসের প্রবাহ, এবং একম্যান আপওয়েলিং (Ekman upwelling) এর কারণে সমগ্র সিস্টেমটি ১০ দিনের কম সময়ের মাঝে ভেঙ্গে যায়। তবে বাস্তুতন্ত্রের এমন মারাত্মক শক্তিশালী হয়ে ওঠা এবং হঠাৎ আবির্ভাবের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পায় সমগ্র বিশ্ব।
বিপদের কারণ
প্রশ্ন আসতে পারে কেন ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ব্লুম কে ‘খারাপ’ চোখে দেখা হয়? উত্তর হলো অনেকগুলো কারণে। তবে এখানে প্রধান কিছু কারণ উল্লেখ করছি। আর্কটিক মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্র এবং খাদ্যশৃঙ্খল খুবই ভঙ্গুর এবং সংবেদনশীল। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ব্লুম এর উপস্থিতি এই সিস্টেম এর খাদ্যজালের গতিবিধি নেতিবাচকভাবে পরিবর্তন করে। যখন সঠিক সময়ের (সাধারণত গ্রীষ্মকাল) আগে বা পরে ব্লুম চলে আসে, তখন সেই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের ওপরে নির্ভরশীল প্রাথমিক স্তরের খাদকেরা নতুন সময় এবং খাদ্য প্রাপ্যতার সাথে মানিয়ে নিতে পারে না এবং তাদের অনেকে মারা পড়ে। প্রাথমিক স্তরের খাদকরা মারা পড়লে তাদের ওপর নির্ভরশীল দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের খাদকরাও মারা যেতে শুরু করে এবং সম্পূর্ণ খাদ্যশৃঙ্খলে একটি বিপর্যয় নেমে আসে [6]। এছাড়াও, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ব্লুম আঞ্চলিক প্রাণীকুল (এমনকি মানুষ) এর জন্যেও বিষাক্ত জৈব উপাদান সৃষ্টি করে।
গবেষকদের ধারণা সারা বিশ্বের সমুদ্রের স্রোতচক্রের একটি পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের হার আর্কটিক মহাসাগরে আরও বেশি কারণ বিগত কয়েক দশকে এখানকার বরফের বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ার মতো বদলেছে। আর্কটিক মহাসাগরে সম্প্রতি আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অনেক পুষ্টি উপাদানের অনুপ্রবেশ বেড়ে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো পৃথিবীর অনেকগুলো বড় নদী (Mackenzie River, Lena River, Yenisei River, Yukon River, Ob River, Kolyma River) সরাসরি আর্কটিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত। ঐতিহাসিকভাবে, এই নদীগুলো বেশিরবভাগ সময়েই বরফে ঢাকা ছিল, কিন্তু গত এক দশক ধরে তাদের অনেকগুলিই এখন বছরব্যাপী প্রবহমান। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডক্টর কেভিন আরিগো সম্প্রতি তার গবেষণা পত্রে বলেছেন-
“আর্কটিক মহাসাগর এখন অনেক কার্বন শুষে নিচ্ছে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা আমাদের জলবায়ুর জন্য কোন সুসংবাদ নয়।” একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ডক্টর কেট লুইস বলেন, “ফাইটোপ্ল্যাংটন এখন অনেক বেশি পরিমাণে কার্বন গ্রহণ করছে কারণ বছরের পর বছর ধরে নতুন পুষ্টি উপাদান আর্কটিক মহাসাগরে যুক্ত হচ্ছে। এই ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত, এবং সত্যি বলতে ভবিষ্যতে এর একটি বড় ধরনের বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত প্রভাব থাকবে।”
পরিশিষ্ট
ফাইটোপ্ল্যাংক্টনের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন আলো এবং পুষ্টি। বরফের আস্তরণ কমে যাওয়া এবং বরফে ঢাকা নদীগুলো গলে গিয়ে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান প্রবাহিত হওয়ার কারণে আর্কটিক মহাসাগরে ফাইটোপ্ল্যাংক্টন ব্লুম ভবিষ্যতে শুধু বাড়তেই থাকবে। এখন পর্যন্ত এই ব্লুম একটি ঋতুকালীন ঘটনা (বিশেষত গ্রীষ্মকাল)। তবে কিছু বিজ্ঞানীদের ধারণা আগামী এক দশকের মাঝেই সারা বছর ধরে আঞ্চলিক ফাইটোপ্ল্যাংক্টন ব্লুমের দেখা পাওয়া যাবে [7]। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে যে হারে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটাও ফাইটোপ্ল্যাংক্টন ব্লুম এর জন্য আদর্শ। পৃথিবীর উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু কোটি বছর ধরে বরফে ঢাকা ছিল। এতে চাপা পড়েছিল অনেক অজানা বিপজ্জনক জীবাণু বা ভয়ংকর ভাইরাসের অণুজীব। এই সাম্প্রতিক ফাইটোপ্ল্যাংক্টন ব্লুম যেন আমাদেরকে সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখানো পুরো পৃথিবীতে মহামারি ঘটাতে সক্ষম বিলুপ্তপ্রায় ব্যাকটেরিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র–
- Loss of sea ice in the Arctic
- Ocean freshening, sea level rising, sea ice melting.
- Harmful algal blooms in the Arctic
- The frequency and extent of sub-ice phytoplankton blooms in the Arctic Ocean.
- Massive phytoplankton blooms under Arctic sea ice.
- Evidence of phytoplankton blooms under Antarctic sea ice.
- Algal export in the Arctic Ocean in times of global warming.
Leave a Reply