কার্ল সাগানের লেখা ‘দ্য ডিমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড: সায়েন্স অ্যাজ আ ক্যান্ডেল ইন দ্য ডার্ক’ বইয়ের কোনো না কোনো অংশ কয়েক মাস পরপরই অনলাইনে ভাইরাল হয়। কারণটা বোধ করি বইটার ভবিষ্যৎবাণী। সাগান এমন এক পৃথিবীর কথা বলছেন যেখানে যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সংশয়বাদ ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গা দখল করছে ভুল তথ্য ও অন্ধবিশ্বাসের এক বিস্তীর্ণ জঞ্জাল।
উদাহরণস্বরূপ এই অংশটির কথা বলা যায়:
“আমি আমার সন্তান বা নাতি-নাতনিদের সময়ের আমেরিকা নিয়ে এক অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছি—যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হবে একটি সেবা ও তথ্যনির্ভর অর্থনীতিতে; যখন প্রায় সব উৎপাদনশীল শিল্প অন্য দেশে চলে যাবে; যখন অসীম প্রযুক্তিগত ক্ষমতা গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকবে, এবং জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী কেউ বিষয়গুলো বুঝতেই পারবে না… যখন আমরা স্ফটিক পাথর আঁকড়ে ধরে স্নায়ুর চাপে ভুগে রাশিফল মেলাব, আমাদের বিচারবুদ্ধি লোপ পাবে, কোনটা ভালো লাগে আর কোনটা সত্যি—তার পার্থক্য করতে না পেরে আমরা প্রায় নিজেদের অজান্তেই আবার সেই কুসংস্কার আর অন্ধকারের দিকে পিছলে পড়ব।”
সাগান নিজে নস্ট্রাডামুস ছিলেন না, তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। যে কোনো দাবি কেবল প্রমাণের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত- এই ছিল তাঁর জীবনবোধ। তিনি বেশ ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলেন, যে বর্তমান এবং অতীত সম্পর্কে ঝা চকচকে ধারণা ছাড়া ভবিষ্যৎকে বোঝা যায় না। একদিক থেকে দেখলে, ‘দ্য ডিমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড’ হলো চারপাশের জগৎকে বোঝার একটি নির্দেশিকা। সাগান এখানে ছোট ছোট গল্প ও উদাহরণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আসলে কী এবং দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে তা প্রয়োগ করতে হয়, তা ব্যাখ্যা করেছেন। আর ঠিক এই কারণেই বর্তমান সময়ে বইটি এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যখন পৃথিবীকে বোঝা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অনেকেই তা বোঝার চেষ্টাই ছেড়ে দিয়েছেন।
সাগানের লেখা এবং সম্পাদনায় বের হওয়া বইয়ের সংখ্যা বিশের ওপর। কোনটিকে তাঁর সেরা কাজ বলা যায়, তা ঠিক করতে গেলে অবধারিতভাবেই বলতে হয় ‘কসমস’-এর কথা। সর্বোপরি, তাঁর লেখা অসম্ভব সুন্দর, এবং মহাবিশ্ব নিয়ে তাঁর বর্ণনা সবসময়ই আমাদের বিস্ময়ে বিমোহিত করে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যারা যুক্তির ওপর ভর করে চিন্তা করতে চান কিংবা করেন, তাদের অবশ্যই ‘দ্য ডিমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড’ পড়া উচিত। সাগানের অসামান্য গদ্যশৈলী এই বইয়েও অটুট আছে। বইটি পুনরায় পড়তে গিয়ে প্রায়ই কোনো একটি বাক্যে আমার দৃষ্টি আটকে গেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে ভেবেছি, আমি কি জীবনেও এত সুন্দর কিছু লিখতে পারব, নাকি আমার এখনই লেখালেখি ছেড়ে দেওয়া উচিত!

মহাকাশচারী জন গ্লেন যখন ক্যাপসুলের বাইরে ঘুরপাক খাওয়া “জোনাকি” দেখেছিলেন (যা আসলে ছিল জ্বলন্ত রঙের ছোট টুকরো), তা নিয়ে সাগান লিখেছিলেন: “অপূর্ব কিছুর প্রতি আকর্ষণ আমাদের বিচারবুদ্ধিকে ভোঁতা করে দেয়।
এই চমৎকার লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে এক পরম উষ্ণতা, মহাবিশ্বের বিস্ময়গুলোর প্রতি অকৃত্রিম মুগ্ধতা, আর সেই সাথে সহানুভূতি, মানবতা এবং আত্মার উদারতা। এটা স্পষ্ট যে, মানুষের প্রিয় ভ্রান্ত ধারণাগুলো খণ্ডন করার সময়ও সাগান কাউকে ছোট করে দেখেননি—তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তির বদলে ভুল ধারণাগুলোকে ভেঙে দেওয়া। আজকের এই ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ ও ক্রোধে উন্মত্ত পৃথিবীতে বসে কেউ যদি ‘দ্য ডিমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড’ বইটি লিখতে যেতেন, তবে এটিকে কোনো ইশতেহার বা তিক্ত সমালোচনায় পরিণত হওয়া থেকে বাঁচানো কঠিন হতো। বরং এখানে সাগানের উষ্ণতা, রসবোধ এবং সুচিন্তিত যুক্তিগুলো বেশ প্রশান্তিদায়ক। ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি নিয়ে তিনি মোটেও রাগান্বিত নন, বরং হতাশ। তিনি স্বীকার করেছেন যে ভুল তথ্য একটি কাঠামোগত সমস্যা হতে পারে, কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; তবে ব্যক্তি হিসেবে আমরা চাইলেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি।
বর্তমানে তথ্য সন্ধান যেমন সহজ, তেমনি ভুল তথ্যের স্রোতে গা ভাসানোও অনেক সহজ। ঠিক এ কারণেই বইটি এখন এতটা প্রাসঙ্গিক। এই বইটির কাজ শুধু ভুল তথ্য খণ্ডন করা বা বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করাই নয়। সত্যি বলতে, বইয়ে উল্লেখিত অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যই এখন বেশ পুরোনো—কেননা বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে—তবে শেষ বিচারে এটি আসলে কোনো ব্যাপারই নয়। এটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে লেখা কোনো বই নয়; বরং এটি বিজ্ঞানের প্রক্রিয়া নিয়ে লেখা। এটি মূলত চিন্তাভাবনা করার একটি নির্দেশিকা।
সর্বোপরি, বিজ্ঞানের প্রক্রিয়া কেবল ল্যাবরেটরির চারদেয়ালে বন্দি থাকে না; প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে যেসব ধারণা তুলে ধরা হয়, সেগুলোকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করি, এটি তারই রূপ। বর্তমান সময়ে এই মূল্যায়ন করাটা ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই কঠিন কাজটি যে বৃথা যায় না, ‘দ্য ডিমন-হন্টেড ওয়ার্ল্ড’ বইটি যেন তারই এক দারুণ অনুস্মারক। একই সাথে এটি সত্য, মিথ্যা এবং ডাহা মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার এক চমৎকার নির্দেশিকাও বটে। কোনটি সত্যি আর কোনটি মিথ্যা, তা সবসময় খালি চোখে ধরা পড়ে না। তাই সাগানের তথাকথিত ‘বালোনি ডিটেকশন কিট’ বা বাজে কথা শনাক্ত করার পদ্ধতিগুলো সত্যিই অত্যন্ত কার্যকর এবং মনে রাখার মতো। এটি সাগানের মতো আপনাকেও হয়তো নস্ট্রাডামুস বানিয়ে দেবে না, কিন্তু এটি আপনাকে চারপাশের পৃথিবীটাকে বুঝতে সাহায্য করবে। আর সেই সাথে উপরি পাওনা হিসেবে আপনি পাবেন একরাশ বিস্ময়।
তথ্যসূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট এ প্রকাশিত “Carl Sagan’s The Demon-Haunted World is still supremely relevant today” শিরোনামে লেখা থেকে অনূদিত।








Leave a Reply