• গবেষণার দর্শন খুবই ব্যক্তিনির্ভর। গবেষণা ব্যাপারটি একেকজন একেকভাবে হৃদয়ঙ্গম করে। আমি একজন সমুদ্রবিজ্ঞানী। আমার কাছে ‘গবেষণা’ সেভাবেই ধরা দেয় যেভাবে সমুদ্র আমাদেরকে ধরা দিতে চায়। বিগত চার বছর খুব কাছ থেকে আমি সমুদ্র দেখেছি। সমুদ্র আমাকে ডেকেছে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল গর্জন থেকে রোড আইল্যান্ডে আটলান্টিকের শীতল প্রবাহে। সমুদ্রে নেমেছি, ডুবেছি, তার বিশালতায় বিহ্বল হয়েছি, তাকে সম্মান করেছি, লোনা পানির স্পর্শে তার সাথে একীভূত হয়েছি। সমুদ্রকে বোঝা দুষ্কর। সমুদ্র গতিশীল, প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ, রহস্যময়, আত্মনির্ভর, পরাক্রম, সর্বগ্রাসী। তার প্রতিটা ঢেউ এর অন্তরঙ্গ মিলনে লুকিয়ে থাকে প্রেমিকার রহস্যময় মুচকি হাসি।  গবেষক হিসেবে আমরা ঠিক ততটুকুই জানি যতটুকু সমুদ্র…

  • ডোলোর সূত্র বিবর্তন তত্ত্বের জৈবিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নীতিটি ১৯৮০ সালে বেলজিয়ান জীববিজ্ঞানী লুই ডোলো কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়েছিল। এর মূল বক্তব্য হলো, একবার কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া বা বৈশিষ্ট্য বিবর্তনের মাধ্যমে হারিয়ে গেলে সেটি পুনরুদ্ধার বা পুনর্বিবর্তন সম্ভব হয় না। সহজভাবে বলতে গেলে, যখন কোনো জৈবিক বৈশিষ্ট্য একবার হারিয়ে যায়, তখন সেই একই বৈশিষ্ট্যের দিকে বিবর্তন যাত্রা পুনরায় ফিরতে পারে না। ডোলোর সূত্র একটি বিশেষ ধরনের অপ্রত্যাবর্তী (irreversible) বিবর্তনের ধারণা দেয়। অর্থাৎ জীবজগতে কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা জেনেটিক গঠন হারালে বা বদলালে সেটি পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। ডোলো’র সূত্রের কার্যকরী প্রক্রিয়াগুলোকে প্রধানত দুটি মূল…

  • সারাবিশ্বের বিজ্ঞানের মানুষদের কাছে অক্টোবর মাস হল নোবেলের মাস। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও অক্টোবরের ৭, ৮ ও ৯ তারিখে ঘোষিত হয়ে গেল বিজ্ঞানের তিন ক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ীদের নাম। বিজয়ীরা কে, কোন বিষয়ে, কেন এ পুরস্কার পেলেন তা নিয়েই সাজানো হয়েছে এই পর্ব। চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল মাইক্রোআরএনএ আবিষ্কার ও জিন গবেষণায় বিপ্লব চলতি বছর চিকিৎসা ও শারীরতত্ত্বে নোবেল গেলো ভিক্টর অ্যামব্রোস আর গ্যারি রাভকুন এর ঝুলিতে। মাইক্রোআরএনএ আবিষ্কার এবং ট্রান্সক্রিপশন পরবর্তী জিন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ভিক্টর অ্যামব্রোস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উমাস চ্যান মেডিকেল স্কুলের ডেভেলাপমেন্ট জীববিজ্ঞানের গবেষক। অন্যদিকে রাভকুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল…

  • আমাদের রক্ত সংবহনতন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি বাঁধ আছে। একে ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার (Blood-Brain Barrier) বলা হয়। এটি রক্ত থেকে অবাঞ্চিত কোনো কিছু মস্তিষ্কে প্রবেশ করা থেকে বাধা দেয়। যেমন রক্তে যদি কোন জীবাণু, বড় অণু কিংবা পানিআকর্ষী অণু ইত্যাদি থাকে, তাদেরকে আটকে দেয় এই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিযারটি। মস্তিষ্ক আমাদের অতি গুরুত্বপূর্ন অঙ্গ হওয়ায় তার সুরক্ষার জন্যই মূলত এই চেকপয়েন্টের ব্যবস্থা। ব্যারিয়ারটি মূলত কৈশিক জালিকার এন্ডোথেলিয়াল কোষ ও তাতে লেগে থাকা মস্তিষ্কের কিছু কোষ দিয়ে তৈরি। মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে আছে এস্ট্রোসাইট (তারকার ন্যায় গ্লিয়াল কোষ) এর প্রান্ত এবং পেরিসাইট নামক বিশেষ কোষ। কৈশিক জালিকার এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলো একে অন্যের…

  • শুরু করি একটি মজার  তথ্য দিয়ে। আমাদের বায়ুমণ্ডল কতখানি উঁচু পর্যন্ত বিস্তৃত? ঘনত্বের হেরফের হবে, তবে ভূমি থেকে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার উঁচু পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের বিস্তার। দশ হাজার কিলোমিটার কিন্তু অনেক বড় একটি দূরত্ব। আপনি যদি দিনে মাত্র ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে, বাকি এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, কোন বিশ্রাম না নিয়ে খুবই দ্রুতগতিতে হাঁটতে থাকেন, তারপরেও বায়ুমণ্ডলের এই দূরত্ব পাড়ি দিতে আপনার সময় লাগবে প্রায় চার মাস!  এই বিশাল বিস্তৃতির বায়ুমণ্ডল কিন্তু পুরো পৃথিবী জুড়ে ঘেরা! তারপরেও এই সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডল সূর্য থেকে আসা বা পৃথিবী থেকে বিকিরিত হওয়া যে পরিমাণ তাপ ধরে রাখে, আপনি কি বলতে…

  • বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর বেশিরভাগ রহস্য হয়তো সমুদ্রেই লুকিয়ে আছে। রহস্যের ডেরা সমুদ্রের প্রানিকুলও যেন বিচিত্র সম্ভার। সমুদ্রের গভীরে ঠিক কত প্রজাতির প্রাণী আছে তার সঠিক তথ্য এখনো জানা যায়নি। ভবিষ্যতেও জানা যাবে কিনে সন্দেহ। যতদূর জানা গেছে সে সংখ্যাটাও নগণ্য। মনে করা হয়, সমুদ্রের এক শতাংশ প্রাণী সম্পর্কে আমরা জানতে পেরেছি। সমুদ্রের জীববৈচিত্র‍্য রক্ষাকারী এমনি কিছু প্রাণী নিয়ে আজকের পর্বটি সাজানো হয়েছে। রাজ কাঁকড়া অগভীর সমুদ্রে অথবা লোনা পানিযুক্ত মোহনার বালুকাময় তলদেশে বসবাসকারী এই প্রাণীটির ইংরেজি নাম হর্স শে ক্রাব (Horse shoe crab) অথবা কিং ক্রাব (King crab)। বাংলায় রাজ কাঁকড়া। এটি আর্থোপোডা (Arthropoda) পর্বের …

  • কখনো কি পুরনো মৃত গাছের পড়ে থাকা গুড়ি বা কান্ডে হয়তো হলুদ রঙের ছোপ চোখে পড়েছে আপনার? কাছে গিয়ে দেখলে মনে হবে ছত্রাক পড়েছে। এদের অনেকেই স্লাইম মোল্ড পরিবারের সদস্য। দেখতে অপ্রয়োজনীয় ছত্রাক মনে হলেও এরা বুদ্ধিমত্তার প্রচলিত সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে। স্লাইম মোল্ড পরিবারের সবচেয়ে আলোচিত সদস্য বোধ হয় ফাইসারাম পলিসেফালাম (Physarum polycephalum)। আলোচিত হবেই না কেন? এদের নিয়ে জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে গেছেন। এরা জটিল গোলকধাঁধা সমাধান করতে পারে, খাবারের জন্যে সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করতে পারে। এমনকি এদের মাঝে এক ধরনের স্মৃতিও রয়েছে। অথচ এদের কোন স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্র নেই। স্নায়ু…

  • ২৭ অক্টোবর, ১৯৫৪ সাল। স্টেডিও আর্টেমিও ফ্রাঞ্চি স্টেডিয়াম। ফ্লোরেন্স, ইতালি। হ্যালোউইন উৎসবের তখনও দিন চারেক বাকি। এরইমধ্যে চমৎকার এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে তৎকালীন দুই পরিচিত ক্লাব–ফিওরেন্টিনা ও পিস্তোইয়েস। উৎসব আর উৎকণ্ঠার আমেজমাখা মুহূর্তে উত্তেজনা বিরাজ করছিল চরম আকারে। জনা হাজার দশেক দর্শকের চিৎকার আর চেঁচামেচিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটি যেন আরো জমজমাট হয়ে উঠেছিল। গুটি গুটি পায়ে বল যখনই গোলবারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো, তখনই হৈ-হুল্লোড়ে ফেটে পড়তে লাগলো সবাই। অর্ধ সময় শেষ। এবার রেফারির বাঁশিতে এলো মধ্যবিরতির নির্দেশ। খেলোয়াড়েরা সারিবেঁধে চললেন বিরতি রুমের দিকে। ছোট্ট বিরতি শেষে ঝাঁঝালো শক্তিতে আবারও ফিরে এলেন মাঠে। শুরু হলো চূড়ান্ত…

  • আল্টিমা থুল (Ultima Thule), যেন এক স্বর্গরাজ্য। পৃথিবীর সর্বোচ্চ উত্তরে যার অবস্থান। উষ্ণতা যেখানে দুর্লভ, আলো যেখানে অপ্রতুল, বছরজুড়ে তুষারপাত এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী ঝড় যেখানে নিত্যসঙ্গী। শতাব্দী ধরে কিংবদন্তিরা যেখানে অভিযান চালাতে চেয়েছে। অন্ধকারের কুয়াশা আর হিমশীতল বরফের ঘূর্ণিঝড়ের ওপারে আলোর আভাসের সন্ধানে অভিযানে বের হয়ে মারা গেছে সহস্র মানুষ। শীতল বরফের আলিঙ্গন একীভূত করেছে কয়েক প্রজন্মের দু:সাহসিক অভিযাত্রী এবং মেরু ভালুকের অস্থি । উত্তর মেরু তারপরেও সহস্র যুগ ধরে ছিল মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে, পরীক্ষিত নাবিকের রোমাঞ্চের বিলাসিতার বাকেট লিস্টে। তাই হয়ত, উত্তর মহাসাগরের কিংবদন্তিদের গল্প থাকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতির লোকগল্পে, হারিয়ে যাওয়া বীরদের উপকথায়,…